শিশুর ডায়রিয়া: ঘরোয়া যত্ন, ওআরএস, জিংক ও বিপদচিহ্ন
শিশুর ডায়রিয়ায় দ্রুত পানিশূন্যতা হতে পারে। কীভাবে ওআরএস ও জিংক খাওয়াবেন, কী খেতে দেবেন, কী এড়াবেন এবং কোন লক্ষণে চিকিৎসক দেখাতে হবে জানুন।
চিকিৎসাগত তথ্য পর্যালোচনা করেছেন ডা. শাকিলুর রহমান, MBBS, FCPS (Part 1), MD (Phase B) · পর্যালোচনার তারিখ: ১ নভেম্বর, ২০২৬
শিশুর ডায়রিয়া: বাড়িতে যত্ন, খাবার স্যালাইন ও কখন হাসপাতালে যাবেন
শিশুর পাতলা পায়খানা বাংলাদেশের বাবা-মায়েদের সবচেয়ে সাধারণ দুশ্চিন্তাগুলোর একটি। এটি বছরের যেকোনো সময় হতে পারে। গরম ও বর্ষার পাশাপাশি শীতকালেও শিশুদের ডায়রিয়া হয়; এ সময় রোটাভাইরাস একটি সাধারণ কারণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেটের জীবাণুর কারণে হয় এবং কয়েক দিনে সেরে যায়। কিন্তু শিশুরা দ্রুত পানি ও লবণ হারাতে পারে, আর পানিশূন্যতা ডায়রিয়াকে বিপজ্জনক করে তোলে।
WHO ডায়রিয়াজনিত রোগকে বিশ্বে ১–৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ বলে এবং জানায়, এটি প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য। এই গাইডে বাবা-মা বাড়িতে কী করতে পারেন এবং কখন চিকিৎসা নেবেন তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
কোনটিকে ডায়রিয়া বলা হয়?
WHO অনুযায়ী, দিনে ৩ বার বা তার বেশি পাতলা বা পানির মতো পায়খানা, অথবা শিশুর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিবার পাতলা পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বলা হয়।
মনে রাখুন:
- ঘন ঘন কিন্তু শক্ত বা স্বাভাবিক আকারের পায়খানা ডায়রিয়া নয়।
- বুকের দুধ খাওয়া শিশুর নরম, পেস্টের মতো পায়খানা স্বাভাবিক হতে পারে। শুধু নরম পায়খানা হচ্ছে বলেই তাকে ডায়রিয়া বলা যায় না।
ডায়রিয়ার ধরন
১. তীব্র পানির মতো ডায়রিয়া — কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন থাকে; কলেরাও এর মধ্যে পড়ে। ২. তীব্র রক্তযুক্ত ডায়রিয়া — একে আমাশয় বা ডিসেন্ট্রি বলা হয়। ৩. দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া — ১৪ দিন বা তার বেশি থাকে।
রক্তযুক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়ায় চিকিৎসক দেখাতে হবে। তবে বিপদচিহ্ন থাকলে এত দিন অপেক্ষা করবেন না।
শিশুদের ডায়রিয়ার কারণ কী?
ডায়রিয়া সাধারণত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবী দিয়ে অন্ত্রে সংক্রমণের কারণে হয়। এসব জীবাণু ছড়াতে পারে:
- দূষিত খাবার বা খাওয়ার পানির মাধ্যমে।
- হাত ঠিকমতো পরিষ্কার না রাখায় একজন থেকে আরেকজনে।
শীতকালে রোটাভাইরাস
বাংলাদেশে শীতকালে শিশুদের ডায়রিয়ার একটি সাধারণ কারণ রোটাভাইরাস। বাংলাদেশের নজরদারি ও গবেষণায় শীতের মাসগুলোতে এই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়তে দেখা গেছে। তবে বছরের অন্য সময়েও রোটাভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে।
শুধু শীতকালে হয়েছে বলে ডায়রিয়াকে হালকাভাবে নেবেন না। শীতের ডায়রিয়াতেও শিশুর শরীর থেকে পানি ও লবণ কমে যেতে পারে। তাই খাবার স্যালাইন দিন, খাওয়ানো চালিয়ে যান এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ খেয়াল করুন।
অপুষ্ট বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার শিশুদের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
দুটি প্রধান চিকিৎসা: ওআরএস ও জিংক
ডায়রিয়ায় শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও লবণ পূরণ করতে ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএস/খাবার স্যালাইন দেওয়া জরুরি। ওআরএস পায়খানা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে না; এটি পানিশূন্যতা প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় সাহায্য করে।
এর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিংক দেওয়া হয়। WHO-এর ডায়রিয়া-বিষয়ক তথ্যপত্রে ১০–১৪ দিনের জিংক কোর্সের কথা বলা হয়েছে।
১. ওআরএস বা খাবার স্যালাইন
- সম্ভব হলে প্যাকেটের ওআরএস ব্যবহার করুন।
- পুরো প্যাকেট প্যাকেটে লেখা ঠিক ততটুকু নিরাপদ পানিতে গুলিয়ে নিন। সব প্যাকেটের জন্য পানির পরিমাণ এক নয়।
- কাপ বা চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাওয়ান।
- শিশু বমি করলে ৫–১০ মিনিট অপেক্ষা করুন, তারপর আরও ধীরে আবার শুরু করুন।
- তৈরি স্যালাইন কতক্ষণ রাখা যাবে, সে বিষয়ে প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলুন। নির্ধারিত সময়ের পর বাকি স্যালাইন ফেলে দিয়ে নতুন করে বানান।
- বাড়তি চিনি, লবণ, দুধ বা জুস মেশাবেন না।
শিশু পান করতে না পারলে, খুব নেতিয়ে পড়লে বা স্যালাইন দেওয়ার পরও পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকলে দ্রুত হাসপাতালে যান।
২. জিংক
- চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী জিংকের পুরো কোর্স শেষ করুন, ডায়রিয়া আগে থেমে গেলেও।
- শিশুর জন্য সঠিক মাত্রা ও কত দিন দিতে হবে, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে নিশ্চিত করুন।
- জিংক ওআরএসের বিকল্প নয়। জিংক দেওয়ার পাশাপাশি খাবার স্যালাইনও দিতে হবে।
সাধারণ ভুল
- কম পানিতে ওআরএস গোলানো।
- ওআরএসের বদলে কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস বা গ্লুকোজ ড্রিংক দেওয়া।
- শিশুকে খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া।
- জিংকের কোর্স নিজের সিদ্ধান্তে আগেভাগে বন্ধ করা।
- শিশুর অবস্থা খারাপ হলেও শুধু বাড়িতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া।
ডায়রিয়ার সময় খাওয়ানো
- বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যান। শিশু বমি করলে অল্প অল্প করে আরও ঘন ঘন খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
- ফর্মুলা খাওয়া শিশুকে স্বাভাবিক ঘনত্বের ফর্মুলা দিন। ফর্মুলা পাতলা করবেন না।
- বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক খাবার চালিয়ে যান। একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার দিন।
- শিশু যখন খেতে পারে, তখন খেতে দিন। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত বা ঝাল খাবার এড়ালে উপকার হতে পারে।
- ডায়রিয়ায় হারানো পানি ও লবণ পূরণ করতে শুধু পানির ওপর নির্ভর করবেন না; ওআরএস দিন।
যেসব শিশু বাড়তি খাবার খায়, তাদের জন্য ভাত, খিচুড়ি, নরম ডাল, চটকানো কলা, সেদ্ধ আলু, দই ও ডিম দেওয়া যেতে পারে—শিশু স্বাভাবিকভাবে যা খায় ও সহ্য করে।
যা এড়িয়ে চলবেন
- ফলের জুস বা কোমল পানীয় দেবেন না—এগুলো ডায়রিয়া বাড়াতে পারে।
- ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধ, যেমন লোপেরামাইড, দেবেন না।
- ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুকে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন দেবেন না।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক দেবেন না।
শিশুদের বেশিরভাগ ডায়রিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না। তবে আমাশয় বা কলেরার মতো কিছু সংক্রমণে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী দিতে পারেন।
কতদিন থাকে?
NHS অনুযায়ী:
- ডায়রিয়া সাধারণত ৫–৭ দিনের মধ্যে থামে।
- বমি সাধারণত ১–২ দিনের মধ্যে থামে।
তবে পানিশূন্যতা বা অন্য বিপদচিহ্ন থাকলে এই সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।
শেষবার ডায়রিয়া বা বমি হওয়ার পর অন্তত ৪৮ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত শিশুকে স্কুল বা নার্সারিতে পাঠাবেন না।
পানিশূন্যতার লক্ষণ
খেয়াল রাখুন:
- ডায়াপার কম ভেজা বা প্রস্রাব কম হওয়া।
- গাঢ়, তীব্র গন্ধযুক্ত প্রস্রাব।
- মুখ ও ঠোঁট শুকনো।
- চোখ বসে যাওয়া।
- কাঁদলে চোখে পানি কম আসা বা না আসা।
- ছোট শিশুর মাথার নরম জায়গা বসে যাওয়া।
- অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, নেতিয়ে পড়া বা খিটখিটে হওয়া।
শিশুকে জাগানো কঠিন হলে, স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দিলে বা পান করতে না পারলে জরুরি হাসপাতালে যান।
একটি কাল্পনিক উদাহরণ
তাসনিমের বয়স ১৮ মাস। সকাল থেকে ৬ বার পানির মতো পায়খানা হয়েছে। সে এখনও বুকের দুধ খাচ্ছে ও চামচে ওআরএস নিচ্ছে, ডায়াপারও ভিজছে। তার বাবা কতবার পায়খানা হচ্ছে এবং কতটা ওআরএস খাচ্ছে তা লিখে রাখছেন।
সন্ধ্যার দিকে সে অস্বাভাবিক ঘুমকাতুরে হয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা ডায়াপার শুকনো থাকে। এগুলো পানিশূন্যতার লক্ষণ হতে পারে, তাই তিনি আর অপেক্ষা না করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
কখন দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ নেবেন
দ্রুত চিকিৎসা নিন যদি:
- ১২ মাসের কম বয়সী শিশুর ডায়রিয়া নিয়ে আপনি চিন্তিত হন।
- অসুস্থ অবস্থায় শিশু বুকের দুধ বা ফর্মুলা খাওয়া বন্ধ করে দেয়।
- শিশুর পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা যায়, বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সে।
- ওআরএস দেওয়ার পরও পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকে।
- শিশু বারবার বমি করে এবং তরল ধরে রাখতে পারে না।
- পায়খানায় রক্ত থাকে বা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হয়।
- ৭ দিনের বেশি ডায়রিয়া বা ২ দিনের বেশি বমি থাকে।
জরুরি: হাসপাতালে যান
নিচের যেকোনো লক্ষণ থাকলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান:
- শিশু খুব নেতিয়ে পড়েছে, জাগানো কঠিন বা স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিচ্ছে না।
- শিশু পান করতে পারছে না, বিশেষ করে সঙ্গে অন্য পানিশূন্যতার লক্ষণ থাকলে।
- রক্তবমি বা কফির গুঁড়োর মতো বমি হচ্ছে।
- হলদে-সবুজ বা সবুজ বমি হচ্ছে।
- বিষাক্ত কিছু গিলে ফেলার সম্ভাবনা আছে।
- ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে এবং উজ্জ্বল আলোতে তাকাতে ব্যথা হচ্ছে।
- হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা বা তীব্র পেটব্যথা হয়েছে।
- ত্বক, ঠোঁট বা জিহ্বা নীল, ধূসর, খুব ফ্যাকাশে বা ছোপ ছোপ দেখাচ্ছে। বাদামি ত্বকে হাতের তালু ও পায়ের তলায় পরিবর্তন বেশি বোঝা যেতে পারে।
- তীব্র শ্বাসকষ্ট হচ্ছে বা খুব দ্রুত, ছোট ছোট শ্বাস নিচ্ছে।
প্রচুর চাল-ধোয়া পানির মতো পায়খানা হলেও দ্রুত হাসপাতালে যান। এটি কলেরার ইঙ্গিত হতে পারে এবং দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে।
ডায়রিয়া প্রতিরোধ
নিরাপদ খাওয়ার পানি, স্যানিটেশন ও পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে ডায়রিয়াজনিত রোগের বড় অংশ প্রতিরোধ করা যায়।
- টয়লেটের পর, ডায়াপার বদলানোর পর এবং খাবার তৈরি বা শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
- নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে পানি ফুটিয়ে ঠান্ডা করে বা যথাযথভাবে বিশুদ্ধ করে দিন।
- প্রথম ৬ মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ান। তবে ডায়রিয়া হলে প্রয়োজন অনুযায়ী ওআরএস ও চিকিৎসকের নির্দেশিত চিকিৎসা দিতে হবে।
- খাবার ঢেকে রাখুন এবং টাটকা রান্না করা খাবার দিন।
- স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ব্যবহার করুন।
- ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুর নির্ধারিত টিকাগুলো সময়মতো দিন।
পায়খানা বা বমি লেগে যাওয়া কাপড় ও বিছানার চাদর আলাদা ধুয়ে নিন। টয়লেট সিট, কল ও দরজার হাতল পরিষ্কার রাখুন এবং তোয়ালে ভাগাভাগি করবেন না।
রোটাভাইরাসের টিকা
রোটাভাইরাসের টিকা শিশুদের এই ভাইরাসজনিত গুরুতর ডায়রিয়া থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এই টিকার দুটি পরিচিত নাম হলো Rotarix (রোটারিক্স) ও RotaTeq (রোটাটেক)। এগুলো মুখে খাওয়ানো হয়, ইনজেকশন নয়।
WHO-এর সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রোটাভাইরাসের টিকা বাংলাদেশের নিয়মিত ইপিআই টিকাদান সূচিতে অন্তর্ভুক্ত নেই। তাই ইপিআই-এর সব টিকা দেওয়া থাকলেও শিশুর রোটাভাইরাসের টিকা দেওয়া হয়েছে—এমন ধরে নেবেন না। টিকাকার্ড দেখে নিশ্চিত হোন এবং শিশু ডাক্তার বা টিকাকেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করুন।
- শিশুর বয়স ৬ সপ্তাহ হওয়ার পর থেকেই রোটাভাইরাসের টিকা শুরু করা যায়।
- টিকার ধরন অনুযায়ী ডোজের সংখ্যা ও দেওয়ার সময়সূচি আলাদা।
- টিকা শুরু ও শেষ করার নির্দিষ্ট বয়সসীমা রয়েছে। তাই শিশুর প্রথম দিকের টিকা দেওয়ার সময়ই এ বিষয়ে জেনে নিন।
- কোন টিকা শিশুর জন্য উপযুক্ত এবং কোথায় পাওয়া যাবে, তা চিকিৎসক বা টিকাকেন্দ্রের কাছ থেকে নিশ্চিত করুন।
এই টিকা সব ধরনের ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে না এবং চলমান ডায়রিয়ার চিকিৎসাও নয়। টিকা দেওয়া থাকলেও ডায়রিয়া হলে ওআরএস, খাওয়ানো চালিয়ে যাওয়া এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ খেয়াল করা জরুরি।
আরও পড়ুন: শিশুর জ্বরও থাকলে দেখুন শিশুর জ্বর: কখন চিন্তা করবেন। দীর্ঘ জ্বর ও পেটের সমস্যায় আক্রান্ত বড় শিশুদের জন্য পড়ুন টাইফয়েডের লক্ষণ, আর কেন সবসময় অ্যান্টিবায়োটিক লাগে না জানতে পড়ুন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
শিশুকে কতটুকু ওআরএস দেব?
প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর অল্প অল্প করে ঘন ঘন দিন। শিশুর বয়স, ওজন ও পানিশূন্যতার অবস্থা অনুযায়ী কতটা লাগবে, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন। শিশু পান করতে না পারলে বা খুব নেতিয়ে পড়লে হাসপাতালে যান।
ডায়রিয়ায় কি জিংক জরুরি?
শিশুর ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ওআরএসের পাশাপাশি জিংক দেওয়া হয়। WHO-এর ডায়রিয়া-বিষয়ক তথ্যপত্রে ১০–১৪ দিনের কোর্সের কথা বলা হয়েছে। শিশুর জন্য সঠিক মাত্রা ও কোর্স চিকিৎসকের কাছ থেকে নিশ্চিত করুন।
শিশুকে কি লোপেরামাইড দিতে পারি?
না। NHS অনুযায়ী, ১২ বছরের কম বয়সী শিশুকে লোপেরামাইডের মতো ডায়রিয়া বন্ধের ওষুধ দেওয়া উচিত নয়।
ডায়রিয়ায় কি দুধ বন্ধ রাখব?
না। বুকের দুধ বা স্বাভাবিক ঘনত্বের ফর্মুলা চালিয়ে যান। ফর্মুলা পাতলা করবেন না।
শিশুর ডায়রিয়া কখন জরুরি?
শিশু খুব নেতিয়ে পড়লে, জাগানো কঠিন হলে, স্বাভাবিকভাবে সাড়া না দিলে, পান করতে না পারলে বা সবুজ বমি হলে জরুরি হাসপাতালে যান। প্রস্রাব কমে যাওয়া, পায়খানায় রক্ত বা বারবার বমি হলেও দ্রুত চিকিৎসা নিন।
দাঁত ওঠার সময় কি ডায়রিয়া হয়?
দাঁত ওঠাকেই ডায়রিয়ার কারণ ধরে নেবেন না। পাতলা পায়খানা হলে ওআরএস দিন, পানিশূন্যতার লক্ষণ খেয়াল করুন এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসক দেখান।
শীতকালেও কি শিশুর ডায়রিয়া হয়?
হ্যাঁ। বাংলাদেশে শীতকালে শিশুদের ডায়রিয়ার একটি সাধারণ কারণ রোটাভাইরাস। শীতের ডায়রিয়াতেও পানিশূন্যতা হতে পারে।
ইপিআই-এর সব টিকা দেওয়া থাকলে কি রোটাভাইরাসের টিকাও দেওয়া হয়েছে?
না, এমন ধরে নেওয়া যাবে না। WHO-এর সর্বশেষ প্রকাশিত বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, রোটাভাইরাসের টিকা নিয়মিত ইপিআই সূচিতে অন্তর্ভুক্ত নেই। শিশুর টিকাকার্ড দেখে এবং শিশু ডাক্তার বা টিকাকেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হোন।
রোটাভাইরাসের টিকার নাম কী?
দুটি পরিচিত নাম হলো Rotarix ও RotaTeq। এগুলো মুখে খাওয়ানো হয়। শিশুর বয়স ও টিকার ধরন অনুযায়ী সময়সূচি নির্ধারণ করতে হয়, তাই প্রথম দিকের টিকা দেওয়ার সময়ই চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
রোটাভাইরাসের টিকা দিলে কি আর ডায়রিয়া হবে না?
টিকা রোটাভাইরাসজনিত গুরুতর ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, কিন্তু সব ধরনের ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে না। তাই নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্নতা এবং ডায়রিয়া হলে যথাযথ যত্ন জরুরি।
ShifaMate-এ শিশু ডাক্তারের পরামর্শ নিন
শিশুর হালকা ডায়রিয়া থাকলে এবং কোনো বিপদচিহ্ন না থাকলে, ShifaMate-এ শিশু ডাক্তারসহ যাচাইকৃত চিকিৎসকদের প্রোফাইল দেখে অ্যাপে পরামর্শ নিতে পারেন।
চিকিৎসককে জানান:
- শিশুর বয়স ও ওজন।
- কত দিন ধরে এবং দিনে কতবার পাতলা পায়খানা হচ্ছে।
- পায়খানায় রক্ত আছে কি না।
- জ্বর বা বমি আছে কি না।
- কতটা বুকের দুধ, খাবার ও ওআরএস নিচ্ছে।
- ডায়াপার কতবার ভিজছে বা প্রস্রাবের পরিমাণ কমেছে কি না।
ShifaMate-এর চিকিৎসকদের পূর্ণ তালিকা দেখুন।
শিশুর পানিশূন্যতা বা কোনো জরুরি লক্ষণ দেখা দিলে অনলাইন পরামর্শের জন্য অপেক্ষা না করে সরাসরি হাসপাতালে যান।
তথ্যসূত্র
- World Health Organization. Diarrhoeal disease
- NHS. Diarrhoea and vomiting
- NHS. High temperature (fever) in children — dehydration signs
- IEDCR. Surveillance Report, 2024 — বাংলাদেশে রোটাভাইরাসের মৌসুমি প্রকোপ
- World Health Organization. Rotavirus — রোগ ও টিকা সম্পর্কে তথ্য
- World Health Organization. Introduction of rotavirus vaccine for Bangladesh
এই লেখাটি শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
তথ্যসূত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬
এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য, কোনো ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার নিজের অবস্থার জন্য একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।