প্রাপ্তবয়স্কদের জন্ডিসের কারণ: চোখ বা ত্বক কেন হলুদ হয় এবং কী করবেন
চোখ বা ত্বক হলুদ? বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্ডিসের সাধারণ কারণ — হেপাটাইটিস থেকে পিত্তথলির পাথর — কোন পরীক্ষা হতে পারে এবং কখন সাহায্য নেবেন জানুন।
চিকিৎসাগত তথ্য পর্যালোচনা করেছেন ডাঃ আতিকুর রহমান শুভ, MBBS · পর্যালোচনার তারিখ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশে "জন্ডিস" শব্দটি সবার চেনা। কোনো প্রাপ্তবয়স্কের চোখ হলুদ হলে পরিবার প্রায়ই ঘরোয়া টোটকা, বিশেষ খাবার বা প্রথাগত "জন্ডিসের মালা"-র শরণাপন্ন হয়। কিন্তু জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয় — এটি একটি লক্ষণ, যা বোঝায় লিভার, পিত্তনালী বা রক্তে কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে।
NHS বলে, জন্ডিস লিভারের রোগের মতো গুরুতর কিছুর লক্ষণ হতে পারে, তাই দ্রুত চিকিৎসা সাহায্য নিতে হবে। এই গাইডে জন্ডিস কী, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণ কারণ, কোন পরীক্ষা হতে পারে এবং কোন সতর্কসংকেতে হাসপাতালে যেতে হবে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এই লেখাটি প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে। NHS অনুযায়ী নবজাতকের জন্ডিস সাধারণ এবং সাধারণত ক্ষতিকর নয়, তবুও চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীকে দিয়ে দেখিয়ে নেওয়া উচিত।
জন্ডিস কী?
NHS ব্যাখ্যা করে, জন্ডিস হলো যখন ত্বক বা চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়। শরীরে বিলিরুবিন নামের একটি পদার্থ জমে গেলে এটি হয়।
জন্ডিসের লক্ষণ (NHS)
- হলুদ ত্বক
- চোখের সাদা অংশ হলুদ — বাদামি ত্বকে চোখই প্রায়ই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ
- ত্বকে চুলকানি
- স্বাভাবিকের চেয়ে গাঢ় প্রস্রাব
- স্বাভাবিকের চেয়ে ফ্যাকাশে পায়খানা
কীভাবে দেখবেন
প্রাকৃতিক দিনের আলোয় চোখের সাদা অংশ দেখুন। হলদেটে বাল্বের আলোয় চোখ হলুদ না হলেও হলুদ দেখাতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্ডিসের সাধারণ কারণ
NHS যেসব কারণ উল্লেখ করে:
- হেপাটাইটিস (লিভারের প্রদাহ)
- পিত্তথলির পাথর
- অ্যালকোহলজনিত লিভার রোগ
- প্যানক্রিয়াটাইটিস
- সিকল সেল রোগ
বাংলাদেশে এসব ও অন্যান্য কারণ কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিচে দেওয়া হলো।
১. ভাইরাল হেপাটাইটিস — খুবই সাধারণ
ভাইরাস দিয়ে লিভারের সংক্রমণ জন্ডিসের একটি প্রধান কারণ।
হেপাটাইটিস ই
- WHO বলে, হেপাটাইটিস ই মূলত দূষিত পানির মাধ্যমে (মল-মুখ পথে) ছড়ায় এবং পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি।
- বেশি আক্রান্ত এলাকায় লক্ষণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ১৫–৪০ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে।
- লক্ষণ (WHO): কয়েক দিন হালকা জ্বর, খিদে কমে যাওয়া, বমি ভাব ও বমি, তারপর পেটব্যথা, চুলকানি, র্যাশ বা গিঁটে ব্যথা, জন্ডিস, গাঢ় প্রস্রাব ও ফ্যাকাশে পায়খানা, এবং লিভার সামান্য বড় ও ব্যথাযুক্ত হওয়া।
- সংস্পর্শ থেকে লক্ষণ দেখা দিতে ২ থেকে ১০ সপ্তাহ লাগে, গড়ে ৫–৬ সপ্তাহ (WHO)।
হেপাটাইটিস এ
- WHO বলে, এটি দূষিত খাবার ও পানি বা আক্রান্ত ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছড়ায়।
- প্রায় সবাই পুরোপুরি সেরে ওঠেন এবং আজীবন প্রতিরোধ ক্ষমতা পান, তবে খুব অল্প কয়েকজনের তীব্র লিভার বিকল হয়।
- একটি নিরাপদ, কার্যকর টিকা আছে (WHO)।
- রক্ত ও শরীরের তরলের মাধ্যমে এবং মা থেকে শিশুতে ছড়ায় (WHO)। এটি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার ঘটাতে পারে।
- হেপাটাইটিস বি নিয়ে আমাদের আলাদা লেখা দেখুন।
২. পিত্তথলির পাথর ও পিত্তনালী বন্ধ হওয়া
পিত্তথলির পাথর লিভার থেকে পিত্ত বহনকারী নল বন্ধ করে দিতে পারে। এতে প্রায়ই হয়:
- পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথা, কখনো পিঠে ছড়ায়
- ফ্যাকাশে পায়খানা ও গাঢ় প্রস্রাব
- সংক্রমণ হলে কখনো জ্বর ও কাঁপুনি — এটি জরুরি অবস্থা
৩. অ্যালকোহল ও অন্যান্য লিভার রোগ
দীর্ঘদিন অ্যালকোহল পানে লিভারের ক্ষতি হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে যুক্ত ফ্যাটি লিভারসহ অন্যান্য লিভার রোগও বাড়তে পারে।
৪. ওষুধ ও ভেষজ পণ্য
কিছু ওষুধ এবং অনিয়ন্ত্রিত ভেষজ বা "লিভার টনিক" পণ্য লিভারের ক্ষতি করতে পারে। যা যা খেয়েছেন সবকিছু চিকিৎসককে জানান।
৫. রক্তের রোগ
লোহিত রক্তকণিকা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত ভাঙলে — যেমন সিকল সেল রোগে (NHS) বা কিছু বংশগত রক্তরোগে — বিলিরুবিন বাড়তে পারে।
৬. প্যানক্রিয়াটাইটিস ও অন্যান্য কারণ
NHS প্যানক্রিয়াটাইটিসের কথা উল্লেখ করে। কম ক্ষেত্রে অগ্ন্যাশয়, পিত্তনালী বা লিভারের টিউমার জন্ডিস ঘটাতে পারে, বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে ওজন কমার সঙ্গে ব্যথাহীন জন্ডিস।
উদাহরণ
রুবেল, ২৩, ময়মনসিংহের একজন শিক্ষার্থী, এক সপ্তাহ ধরে খিদে কম, বমি ভাব ও হালকা জ্বরে ভুগছিলেন। তারপর তাঁর প্রস্রাব গাঢ় হয় এবং চোখ হলুদ হয়ে যায়। তাঁর মেসের কয়েকজন না ফুটিয়ে কলের পানি খাচ্ছিলেন। একজন চিকিৎসক লিভার ফাংশন ও ভাইরাল হেপাটাইটিস পরীক্ষা দেন, যাতে হেপাটাইটিস ই-এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশ্রাম, তরল ও ফলো-আপ রক্ত পরীক্ষায় কয়েক সপ্তাহে তিনি সেরে ওঠেন।
চিকিৎসক যেসব পরীক্ষা দিতে পারেন
অনেক রোগেই জন্ডিস হয় বলে পরীক্ষা অপরিহার্য। সাধারণ পরীক্ষা:
- লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) — বিলিরুবিন, লিভার এনজাইম (ALT/SGPT, AST), অ্যালকালাইন ফসফাটেজ, অ্যালবুমিন
- ভাইরাল হেপাটাইটিস পরীক্ষা — যেমন HBsAg, anti-HEV IgM, anti-HAV IgM
- সিবিসি — সংক্রমণ বা রক্তকণিকা ভাঙা দেখতে
- পেটের আলট্রাসাউন্ড — পিত্তথলির পাথর, বন্ধ নালী বা লিভারের পরিবর্তন দেখতে
- আরও গুরুতর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট বাঁধার পরীক্ষা (যেমন প্রোথ্রোম্বিন টাইম)
WHO জানায়, শুধু লক্ষণ দেখে হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো আলাদা করা যায় না — ল্যাব পরীক্ষা লাগে।
চিকিৎসা নির্ভর করে কারণের ওপর
NHS বলে, চিকিৎসা নির্ভর করে কী কারণে হচ্ছে তার ওপর:
- ভাইরাল হেপাটাইটিস এ বা ই — সাধারণত সহায়ক চিকিৎসা: বিশ্রাম, তরল, পুষ্টি, অ্যালকোহল ও লিভারের ক্ষতিকর ওষুধ এড়ানো, এবং পর্যবেক্ষণ
- হেপাটাইটিস বি — বিশেষজ্ঞের ফলো-আপ এবং কখনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা লাগতে পারে
- পিত্তথলির পাথর বা বন্ধ নালী — প্রক্রিয়া বা অস্ত্রোপচার লাগতে পারে
- অ্যালকোহলজনিত রোগ — অ্যালকোহল ছাড়া ও বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা
- ওষুধজনিত — চিকিৎসকের পরামর্শে কারণটি বন্ধ করা
প্রচলিত ভুল ধারণা
- ❌ "জন্ডিসে হলুদ ছাড়া বিশেষ খাবার খেতে হয়।" — হলুদ বা হলুদ রঙের খাবার এড়ানোর দরকার নেই। সুষম, হালকা খাবার খান এবং পর্যাপ্ত তরল পান করুন।
- ❌ "মালা বা ভেষজ ড্রপে জন্ডিস সারে।" — এগুলো কারণের চিকিৎসা করে না। কিছু ভেষজ পণ্য লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
- ❌ "জন্ডিস সবসময় নিজে থেকে চলে যায়।" — কিছু কারণে যায়; অন্যগুলো গুরুতর এবং চিকিৎসা লাগে।
সতর্কসংকেত: সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান
জন্ডিসের সঙ্গে এগুলো থাকলে ৯৯৯-এ কল করুন বা হাসপাতালে যান:
- বিভ্রান্তি, তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা অস্বাভাবিক আচরণ
- রক্তবমি বা কালো পায়খানা
- রক্তপাত বা সহজে কালশিটে পড়া
- পেট ফুলে যাওয়া বা পা ফোলা
- উচ্চ জ্বর ও কাঁপুনি, বিশেষ করে পেটের ওপরের ডান দিকে ব্যথাসহ
- তীব্র পেটব্যথা
- লাগাতার বমি, পান করতে না পারা
- গর্ভাবস্থা — গর্ভাবস্থায় জন্ডিস হলে দ্রুত পরীক্ষা দরকার
সংক্রমণজনিত জন্ডিস প্রতিরোধ
- নিরাপদ, ফুটানো বা বিশুদ্ধ করা পানি পান করুন — WHO হেপাটাইটিস ই-কে মূলত দূষিত পানির সঙ্গে যুক্ত করে
- সাবান দিয়ে হাত ধুন, বিশেষ করে খাওয়ার আগে ও টয়লেটের পর
- টাটকা রান্না করা খাবার খান; রাস্তার খাবার ও কাঁচা সালাদে সতর্ক থাকুন
- হেপাটাইটিস বি-এর টিকা নিন (এবং হেপাটাইটিস এ-র টিকার কথা জিজ্ঞেস করুন)
- রেজর, সুঁই বা টুথব্রাশ শেয়ার করবেন না
- অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন বা সীমিত রাখুন
- প্রেসক্রিপশন ছাড়া ভেষজ পণ্য খাবেন না
আরও পড়ুন: হেপাটাইটিস বি-এর লক্ষণ নিয়ে আরও জানুন। হেপাটাইটিস এ ও ই অনিরাপদ পানির মাধ্যমে ছড়ায়, টাইফয়েডের মতোই। গর্ভাবস্থায় জন্ডিস জরুরি — দেখুন গর্ভাবস্থার বিপদচিহ্ন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্ডিসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ কী?
ভাইরাল হেপাটাইটিস, পিত্তথলির পাথর ও লিভারের রোগ সাধারণ কারণ। বাংলাদেশে পানিবাহিত হেপাটাইটিস ই তরুণদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ (WHO)।
জন্ডিস কি ছোঁয়াচে?
জন্ডিস নিজে ছোঁয়াচে নয়, তবে এর কিছু কারণ — যেমন হেপাটাইটিস এ, বি ও ই — সংক্রমণ, যা ছড়াতে পারে।
জন্ডিস কতদিন থাকে?
কারণের ওপর নির্ভর করে। ভাইরাল হেপাটাইটিস এ বা ই প্রায়ই কয়েক সপ্তাহে ভালো হয়। অন্য কারণে নির্দিষ্ট চিকিৎসা লাগে।
জন্ডিসে কী খাব?
প্রচুর তরলসহ হালকা, সুষম খাবার। অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন। হলুদ রঙের খাবার এড়ানোর দরকার নেই।
কোন পরীক্ষায় জন্ডিস নিশ্চিত হয়?
বিলিরুবিন মাপার রক্ত পরীক্ষা (লিভার ফাংশন টেস্টের অংশ) দিয়ে নিশ্চিত হয়; অন্য পরীক্ষায় কারণ খোঁজা হয়।
গর্ভাবস্থায় জন্ডিস কি বিপজ্জনক?
হতে পারে। গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস ও অন্যান্য লিভার সমস্যায় দ্রুত চিকিৎসা পরীক্ষা দরকার।
ShifaMate-এ আপনার লিভারের রিপোর্ট দেখিয়ে নিন
জরুরি লক্ষণ ছাড়া হালকা জন্ডিসের লক্ষণ থাকলে, বা লিভার ফাংশন কিংবা হেপাটাইটিস পরীক্ষার ফলাফল বুঝতে চাইলে, ShifaMate-এর মাধ্যমে একজন যাচাইকৃত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারেন। রিপোর্টের ছবি শেয়ার করুন এবং লক্ষণ, ওষুধ ও যেকোনো ভেষজ পণ্যের কথা জানান। চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সরাসরি চিকিৎসা লাগবে কি না সে বিষয়ে পরামর্শ দেবেন। চাইলে ShifaMate-এর চিকিৎসকদের তালিকা দেখুন।
জন্ডিসের সঙ্গে বিভ্রান্তি, রক্তপাত বা রক্তবমি জরুরি অবস্থা — ৯৯৯-এ কল করুন।
তথ্যসূত্র
- NHS. Jaundice
- World Health Organization. Hepatitis E (fact sheet)
- World Health Organization. Hepatitis A (fact sheet)
- World Health Organization. Hepatitis B (fact sheet)
এই লেখাটি শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য; এটি যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।
তথ্যসূত্র
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৩ নভেম্বর, ২০২৬
এই নিবন্ধ সাধারণ স্বাস্থ্যতথ্য, কোনো ব্যক্তির জন্য চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার নিজের অবস্থার জন্য একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। জরুরি অবস্থায় দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে যান।